আগুরী বা উগ্রক্ষত্রিয়রা একটি বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠী। রাঢ়বঙ্গের সঙ্গে, বিশেষত বর্ধমান এবং পার্শ্ববর্তী বীরভূম, বাঁকুড়া ও হুগলি জেলার সঙ্গে তাঁদের নিবিড় ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এই ইতিহাসে গ্রামজীবন, কৃষিকাজ, সৈনিকবৃত্তি, ব্যবসা, শিক্ষা এবং বাংলার জনজীবনে অবদান পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।[১][২]
শিকড়, সৈনিকবৃত্তি ও বসতি
আগুরীদের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত ও জনশ্রুতি আছে। রাজপুত ও উগ্রক্ষত্রিয় গ্রন্থে হরিচরণ বন্ধু রাজপুত যোদ্ধা, বাংলায় সামরিক কাজ এবং ভূমিদানের সঙ্গে এই সমাজের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন।[৩] ইতিহাসবিদ অচিন্ত্যকুমার দত্ত এই প্রশ্নগুলি আলোচনা করলেও জনগোষ্ঠীর চূড়ান্ত উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেননি। অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেই আগুরীদের উপস্থিতির সাক্ষ্য হিসেবে তিনি মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলসহ পুরোনো বাংলা সাহিত্যের উল্লেখ করেছেন (পৃ. ৩০০–৩০৩)।[১]
দত্ত বর্ধমান রাজের নগদ বেতনভোগী নগদী বাহিনীতে উগ্রক্ষত্রিয়দের কাজের কথাও বলেছেন। কোম্পানির শাসনে সেই সামরিক জীবিকা সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে কৃষিকাজ ও জমির উপর নির্ভরতা বৃদ্ধির সম্পর্ক তিনি দেখিয়েছেন (পৃ. ২৯৯–৩০০)।[১] ইতিহাস বিভাগে এই পরিবর্তন ও উৎপত্তির বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাশাপাশি পড়তে পারবেন।
জমি, উদ্যোগ ও সমাজ
অনেক পরিবারের জীবনে কৃষিকাজ প্রধান ছিল। অন্যেরা শস্যের ব্যবসা, ঋণদান, চালকল ও খনিশিল্পে যুক্ত হন। দত্ত আঙ্গুনার হাজরা পরিবার-এর চালকল ও কয়লাখনির উদ্যোগ, সাথীনন্দীর পাঁজা পরিবারের ব্যবসা ও জমিতে বিনিয়োগ এবং বাঁকুড়ার সাহানা পরিবারের নানা বাণিজ্যিক কাজের কথা বলেছেন (পৃ. ৩০৮–৩১০)। সাধারণ ও দরিদ্র কৃষকদের ইতিহাসও এই বিবরণের অংশ; সুযোগ ও সম্পদ সকলের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত ছিল না।[১] অঞ্চল বিভাগে এই কাহিনির সঙ্গে গ্রাম, নদী ও বর্ধমানে আগুরী জনসংখ্যার ঐতিহাসিক কেন্দ্রীভবনের সম্পর্ক পাওয়া যাবে।
সমাজের সংগঠিত উদ্যোগ শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দত্তের মতে, উগ্রক্ষত্রিয় সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৮ সালে। দরিদ্র শিশুদের শিক্ষায় সাহায্য, জানা ও সুতা বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি, পণপ্রথার বিরোধিতা এবং বিধবাবিবাহের সমর্থন ছিল তার কাজের অংশ (পৃ. ৩১১–৩১৩)।[১] এই উদ্যোগগুলি সম্পর্কে পড়ুন সংস্কৃতি ও সমাজজীবন বিভাগে।
ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহ্য
বিশিষ্ট মানুষের জীবন আগুরী ঐতিহ্যকে বৃহত্তর জগতের সঙ্গে যুক্ত করে। ইংরেজি মহাভারত প্রকাশনার মাধ্যমে প্রতাপচন্দ্র রায়, এবং রাজনৈতিক ও কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে বিনয় চৌধুরী ও হরেকৃষ্ণ কোঙার সেই ইতিহাসের অংশ।[৪][১] ব্যক্তিত্ব বিভাগে অজিতকুমার পাঁজা, ডা. রণজিৎকুমার পাঁজা ও শক্তি সামন্ত-সহ আরও অনেকের জীবন ও সম্প্রদায়গত পরিচয়ের উৎস দেওয়া হয়েছে।[৫]
যৌথ আচার ও গ্রামের পারস্পরিক সম্পর্কেও ঐতিহ্য বেঁচে থাকে। যেমন ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা পূজা-র বিবরণে বিভিন্ন সমাজের অংশগ্রহণের মধ্যে আগুরীদের স্থানও দেখা যায়।[৬] সুপরিচিত মানুষের জীবনকথার পাশাপাশি দৈনন্দিন স্মৃতি সংরক্ষণেও এই সম্পর্কগুলি আমাদের উৎসাহিত করে।
ঐতিহ্যের পথে
এই ওয়েবসাইটে বাংলা বই, ঐতিহাসিক নথি ও গবেষণার ভিত্তিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অঞ্চল ও জীবনচরিত একত্র করা হয়েছে। গবেষণা সংগ্রহে অচিন্ত্যকুমার দত্তের গবেষণা এবং বাংলার পরিবর্তনশীল সামাজিক জগৎ নিয়ে সুদর্শনা ভৌমিকের আলোচনা রয়েছে। রাজপুত ও উগ্রক্ষত্রিয়-এর বাংলা মূল ও ইংরেজি অনুবাদ পড়তে পারবেন; আছে নির্বাচিত রচনার পাঠসংগ্রহ। উগ্রক্ষত্রিয়-প্রতিনিধি-র খণ্ডগুলি এই বৃহত্তর সমাজ-ইতিহাসের সহায়ক উপকরণ হিসেবে সংরক্ষিত।
আপনি পারিবারিক ইতিহাস খুঁজতে আসুন, গ্রামের স্মৃতি ফিরে দেখতে আসুন বা প্রথমবার আগুরী সমাজকে জানতে আসুন—আপনাকে স্বাগত। উপরে ডানদিকে ভাষা নির্বাচন করে বাংলা বা ইংরেজিতে পড়ুন। ছবি, নথি বা স্মৃতি ভাগ করে নিতে চাইলে সহযোগিতার নির্দেশিকা দেখুন।


